বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড
Published : Wednesday, 28 March, 2018 at 9:30 PM, Count : 6367

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম :
বিদ্যুত্ উত্পাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয় গত ১৯ মার্চ। ওই দিন বিগত দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে সর্বাধিক বিদ্যুত্ উত্পাদন হয় ১০ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুতের উত্পাদন ক্ষমতা ১৩ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরকারিভাবে ৫৩ শতাংশ, বেসরকারিভাবে ৪২ শতাংশ আর আমদানি ৫ শতাংশ। এখন পর্যন্ত সর্বাধিক বিদ্যুত্ উত্পাদনে জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে গ্যাস। এখাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, ডিজেল জ্বালানিতে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, কয়লা ১ দশমিক ৯০ শতাংশ, পানি ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ আর ফার্নেস অয়েল জ্বালানি ব্যবহার করে উত্পাদন হচ্ছে ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে স্থাপিত উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ২৪৫ মেগাওয়াট আর ওই বছর সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয় ৩ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের স্থাপিত উত্পাদন ক্ষমতা বেড়ে দাড়ায় ১৩ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াটে। গত ১৯ মার্চ দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয় ১০ হাজার মেগাওয়াট যা এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হলো। ২০০৯ সালের পূর্বে বিদ্যুতের অভাবে দেশের অর্থনীতি ছিল পর্যুদস্ত, শিল্প, বাণিজ্য ছিল স্থবির এবং জনজীবনে লোডশেডিং ছিল অসহনীয়। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর এর মধ্যে তিন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বিদ্যুত্ খাতে ৮ বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদ্যুত্ খাত জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে আলোর পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে। বিদ্যুত্ উত্পাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য যৌক্তিক মূল্যে মানসম্মত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে বিদ্যুত্ বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের মোট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট এবং প্রকৃত বিদ্যুত্ উত্পাদন ছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। সে সময় নতুন সরকার বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানপূর্বক বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধিসহ এ খাতের সার্বিক ও সুষম উন্নয়নে তািণক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। একই সঙ্গে বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল, কয়লা, ডুয়েল ফুয়েল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিউক্লিয়ার এনার্জি ভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও মায়ানমার হতে বিদ্যুত্ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের আট বছরে ২০০৯ থেকে ২০১৬ মেয়াদে বিদ্যুত্ খাতে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জিত হয়েছে।
বিদ্যুত্ খাত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। উপর্যুক্ত অর্জনসমূহের পাশাপাশি বর্তমানে মোট ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩১টি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণাধীন আছে, যার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৫টি বিদ্যুেকন্দ্র বেসরকারি খাতের এবং প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৬টি বিদ্যুেকন্দ্র সরকারিখাতের রয়েছে। সূত্র: বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়। এছাড়া ৩১টি বিদ্যুেকন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যার মোট ক্ষমতা প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে প্রায় ৭,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১১টি বিদ্যুেকন্দ্র পরিকল্পনাধীন আছে। সার্বিকভাবে বর্তমানে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতার পাশাপাশি আগামী ২০২১ সাল নাগাদ সবার জন্য বিদ্যুত্ নিশ্চিতকল্পে আরও প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্পাদন পরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্পসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভারত, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি দেশের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়া বলে জানা যায়। এছাড়া পিজিসিবি সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন ও দক্ষ বিদ্যুত্ সঞ্চালন সিস্টেম নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সঞ্চালন গ্রিড নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিগত ৮ বছরে প্রায় ২,৩০০ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ১২ হাজার এমভিএ ক্ষমতার গ্রিড সাব-স্টেশন নির্মিত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ আরও প্রায় ৩৭০০ সার্কিট কিলোমিটার ৪০০ কেভি, ২ হাজার ৮০০ সার্কিট কিলোমিটার ২৩০ কেভি এবং ৪ হাজার সার্কিট কিলোমিটার ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ২০২১ সাল নাগাদ গ্রিড সাব-স্টেশনসমূহের মোট ক্ষমতা হবে প্রায় ১ লাখ এমভিএ। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি বিদ্যুত্ বিতরণ সংস্থা বা কোম্পানি রয়েছে: বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লি. (ডেসকো) এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (ওজোপাডিকো)। সরকার বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উত্পাদিত বিদ্যুত্ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বিতরণ খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
বর্তমানে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার আওতায় মোট বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৩ লাখ ৯৯ হাজার কিলোমিটার, যা ২০০৯ সালে ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। তাছাড়া রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ নিয়ে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গত বছর থেকে যাত্রা শুরু করে। বিতরণ খাতের সিস্টেম লস এবং আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মাধ্যমে গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার চালু করা হয়েছে। আগামী ২ বছরের মধ্যে পুরো বিতরণ সিস্টেম প্রি-পেইড স্মার্ট মিটারের আওতায় আনা হবে। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড বিতরণ সিস্টেম প্রবর্তন করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২০ সাল এবং তার পরবর্তী বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। সারাদেশে ৪৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের ২ কোটিরও বেশি মানুষকে বিদ্যুত্ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। যা পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহত্ সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি। আগামীতে দেশে দ্বীপাঞ্চল ও চরাঞ্চলে সোলার মিনিগ্রিড ও ন্যানোগ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুত্ সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে বিদ্যুত্ সুবিধা পৌঁছে দেয়া হবে। তাছাড়া সোলার পার্ক স্থাপন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার করা হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুত্ খাতে বর্তমান সরকার অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে বা দিচ্ছে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল ফ্রিডম ফাইটার্স ফাউন্ডেশন।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: এ. কে. এম জায়েদ হোসেন খান, নির্বাহী সম্পাদক: নাজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Developed & Maintainance by i2soft