জলবায়ু : পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ
Published : Thursday, 22 March, 2018 at 8:57 PM, Count : 2875

আমিনুর রহমান : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পরিবেশের উপর। সেই সঙ্গে হুমকির মুখে রয়েছে জীববৈচিত্র্য। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর আবহাওয়ার এ পরিবর্তনের জন্য দায়ী বায়ুস্তরে সঞ্চিত হওয়া গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলো মানুষের বিবিধ কর্মের ফলে উত্পন্ন হচ্ছে। গ্রিনহাউজ গ্যাসের মধ্যে বাষ্প, সূক্ষ্ম ধূলিকণার সঙ্গে রয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বিকিরিত হয়ে উষ্ণে ওঠে তার অনেকটাই শোষণ করে নেয়। এসব গ্যাস, এভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এগুলোর দ্বারা সঞ্চিত হয় যা মহাকাশে না গিয়ে সঞ্চিত হতে থাকে এবং এর ফলেই তাপ বাড়তে থাকে। এসব গ্যাসের দ্বারা সঞ্চিত তাপের প্রতিক্রিয়াতেই বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটিকে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া বা গ্রিনহাউজ এফেক্ট বলা হয়। প্রধানত বায়ুমণ্ডলে যত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড জমবে তত বেশি তাপ সঞ্চিত হতে থাকবে। খনিজ, জৈব, জ্বালানি যত বেশি পোড়ানো হবে তত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড উত্পন্ন হবে। এর ফলে আবহাওয়ার তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাবে।
গ্রিনহাউজ গ্যাস উষ্ণ হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা নষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছে। এর ফলে বায়ুঝড়, দাবানল হবার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক বিষাক্ত পদার্থ এবং রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। অনেক কঠিন পদার্থ নির্গত হচ্ছে এবং অতিবেগুনি রশ্মি বায়ুমণ্ডলে বাড়ছে পরবর্তীতে ফসল ও বৃক্ষের ক্ষতি করে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য চেইন নষ্ট হচ্ছে, যা আপাতদৃষ্টিতে অনেক কম গতিসম্পন্ন হলেও ধীরে ধীরে মারাত্মক হুমকি হয়ে আসছে।
যদিও জলবায়ু পরিবর্তন তথা পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোই বেশি দায়ী, তবুও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ পরিবেশ পরিবর্তনের জন্য উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় ১শ’ বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি জানা গেলেও অন্তত চার দশক ধরে সচেতন বিশ্ব এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে, প্রতি এক লাখ বছর অন্তর অন্তর পৃথিবীতে একই ধরনের জলবায়ু ফিরে আসে। সর্বশেষ বরফগলা শেষ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে। তাই পৃথিবীর তাপমাত্রা কমার কথা। অথচ সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে যে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়, মূলত এতেই পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এক সময় মানুষের চিন্তার পরিধিতেই ছিল না। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত এর জলবায়ু বরাবরই বদলেছে। এই বদলের অন্যতম কারণ হলো প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বড় বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত, সূর্যের আলো ও তাপ নির্গমনের তারতম্য এবং সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থান পরিবর্তন। তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিশ্বের বিরাট অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য, জনজীবনসহ সামগ্রিক বিপর্যয় ঘটেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল যেমন- জৈব প্রক্রিয়াসহ, পৃথিবী কর্তৃক গৃহীত সৌর বিকিরণের পরিবর্তন, টেকটোনিক প্লেট, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত ইত্যাদি। তবে বর্তমানকালে সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বলতে সমগ্র পৃথিবীর ইদানীং সময়ের মানবিক কার্যক্রমের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনকে বোঝায়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নামেই বেশি পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাস ইত্যাদি সূচকের পরিবর্তন হয় ও পরবর্তীতে ভূ-পৃষ্ঠে তার প্রভাব পড়ে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূ-পৃষ্ঠে হিমবাহের আয়তনের হ্রাস-বৃদ্ধি। বর্তমানে জলবায়ুর খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। মনুষ্যজনিত গ্রিনহাউজ গ্যাসের ফলে পৃথিবীর উষ্ণায়নকে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন কমাতেই হবে। পৃথিবীর সব দেশেরই ধনীদের বিলাসী জীবনযাত্রার ধরন এ জন্য দায়ী। এই জীবনযাপনের সব মাধ্যম জ্বালানি-নির্ভর। যার মধ্যে কার্বন নির্গমনের সব উপকরণ রয়ে গেছে। গ্রিনহাউজের প্রতিক্রিয়ার মূল কথা হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড ও আরও দুটি গ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূ-পৃষ্ঠের গড় উত্তাপ বাড়ছে। গড় উত্তাপ বহুদিন ধরে মাপা গেলেও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ সরাসরি সূক্ষ্মভাবে মাপা যাচ্ছে মাত্র ১৯৫০ সাল থেকে। পৃথিবীতে প্রধান যে চারটি গ্যাস গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী সেগুলোর শতকরা পরিমাণ হচ্ছে জলীয় বাষ্প ৩৬-৭০ শতাংশ, কার্বন ডাই-অক্সাইড ৯-২৬ শতাংশ, মিথেন ৪-৯ শতাংশ এবং ওজোন ৩-৭ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের প্রধান সমস্যাগুলো হলো- ১. গ্রিনহাউজের প্রভাব, ২. ওজন স্তরে ছিদ্র, ৩. এসিড বৃষ্টি, ৪. বনভূমি ক্ষয়, ৫. চাষাবাদের ভূমি হ্রাস, ৬. পানি দূষণ ও অতিরিক্ত ব্যবহার ও ৭. মত্স্য মজুদ হ্রাস।
উন্নত দেশগুলোর শিল্প বিপ্লবের কারণে অধিক পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য সিএফসি গ্যাস নিঃসরণের ফলে বিশ্ব উষ্ণ হওয়াতে জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পৃথিবীতে মানুষের বিভিন্ন প্রকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ফলে, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, শিল্প-কারখানা ও মোটরযান বৃদ্ধি এবং বনাঞ্চল ধ্বংস ও উজাড়ের ফলে ক্রমান্বয়ে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ব্যবস্থার জীববৈচিত্র্য নির্বিচারে ধ্বংস করে অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে শিল্পায়ন। সতেরো শতকে ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের পর প্রকৃতির এই বিবর্তন আর থেমে থাকেনি। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, পরিবর্তিত অবস্থায় কৃষি অভিযোজন, বনায়ন ধ্বংস, শিল্পায়নের কারণে পৃথিবীর ভূ-ভাগের নিকটস্তরের বায়ুর ও মহাসাগরে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা।
সূর্য হলো তাপশক্তির উত্স। সূর্য এক সময় খুব শীতল ছিল কিন্তু ক্রমে সূর্যের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধারণা করা হয় যে, প্রাকৃতিক কারণেই এই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকবে যা জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে সমর্থন করে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতে ভূ-গর্ভ থেকে উত্তপ্ত লাভা অতিরিক্ত চাপে উত্সারিত হয়। কোনো একটি আগ্নেয়গিরি থেকে এক শতাব্দীতে কয়েকবার লাভা উত্সারিত হয়ে সেখানকার জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মহাসাগরের পৃষ্ঠের ও অভ্যন্তরের পানির তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে পানি প্রবাহের দিক নির্দিষ্ট হয়। বায়ুমণ্ডলে ও সমুদ্রের এই প্রভাবের ফলে এক ধরনের দোলনের সৃষ্টি হয়। সময়ের পরিবর্তনের এই দোলনের কারণে স্থান ভেদে পানির তাপমাত্রার পরিবর্তন হয় এবং পানি প্রবাহের দিক পরিবর্তন হয়। এভাবে সামুদ্রিক স্রোত জলবায়ু পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আইপিসিসির তথ্য মতে, গত শতাব্দীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ০.৭ ডিগ্রি সে. বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালে এ তাপমাত্রা আরও ০.৬৫ ডিগ্রি সে. বাড়বে। পরবর্তীতে ২০৫০ সালে এ তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে ১.৮ ডিগ্রি সে. এবং ২১০০ সালে এর পরিমাণ হবে ২.৪ ডিগ্রি সে.।
জলবায়ু পরিবর্তন দেশের বর্তমান বিভিন্ন সমস্যা ও প্রাকৃতিক ঝুঁকিসমূহ আরও অবনতি ঘটাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ দেখা দিবে তা হচ্ছে ঘন ঘন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় ও ভারি এবং অধিক অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হবে। ফলে নদী প্রভাবের উচ্চতা, উপকূলের ভাঙন ও তলানী বৃদ্ধি পাবে, হিমালয়ের হিমবাহ গলা বৃদ্ধি পাবে, কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে এবং উচ্চতা ও আর্দ্র আবহাওয়া বৃদ্ধি পাবে। ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে প্রতিবেশ ব্যবস্থা অর্থনীতি, সমাজ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
এই বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কল-কারখানার ধোঁয়া নির্গমন রোধ, যানবাহন থেকে এ বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ অনুকূল বিকল্প নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ অনুকূল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ- এর মধ্যে রয়েছে। এছাড়াও কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজেদের জন্য অক্সিজেন বৃদ্ধি প্রয়োজন। গাছপালা বায়ুতে অক্সিজেন ছাড়ে। কিন্তু মানুষের লোভের মুখে বন-জঙ্গল, অরণ্য খুব দ্রুতহারে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। এটির পরিণতিতে বায়ুর কার্বন ডাই-অক্সাইড যে পরিমাণে শোষিত হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। সুতরাং যে কোনোভাবেই হোক গাছপালার বৃদ্ধি ও বনভূমি সংরক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।
লেখক: পরিবেশবিদ



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: এ. কে. এম জায়েদ হোসেন খান, নির্বাহী সম্পাদক: নাজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Developed & Maintainance by i2soft