রাজধানীতে যানজট: আর্থিক ক্ষতির চেয়েও মারাত্মক শব্দ দূষণ
Published : Sunday, 25 February, 2018 at 9:08 PM, Count : 7112

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম : রাজধানী ঢাকার আয়তন ১ হাজার ৬২৪ বর্গকিলোমিটার। ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ মোটর যান কয়েছে। আর অযান্ত্রিক যানের কোনো হিসাব নেই। সিটি করপোরেশনের হিসাবে বৈধ রিকশা ৮৭ হাজার। আর অবৈধ রিকশা আছে প্রায় ১১ লাখ। ধরে নেয়া যায় রাজধানীতে অযান্ত্রিক যানের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি (ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়িসহ)। এই ছোট ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে যানজট। যানজটের শহর ঢাকা। যানজনের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি, পরিবেশ দূষণ, বিশেষ করে শব্দ দূষণ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। আসা যাক যানজটের কারণে ক্ষতির কথায়। যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই তথ্য বিশ্বব্যাংকের। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্থিক ক্ষতির এ আনুমানিক পরিমাণ পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। তীব্র যানজটের সময় গাড়ির আগে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর কাছে অপরিচিত নয়। যানজটের পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও যে বাড়বে, তা বলা বাহুল্য। যানবাহনের পরিমাণ যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতি, পরিবেশের ক্ষতি বিশেষ করে শব্দ দূষণ এরই মধ্যে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যানবাহনের হর্ন, দ্রুতগতির যানবাহনের শব্দ, রাজধানীবাসীর যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের হাইড্রোলিক হর্নের আওয়াজ রাজধানীর শব্দ দূষণকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর সঙ্গে আছে আবাসিক এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনার কাজে ব্যবহূত মেশিনের শব্দ; যা ক্রমাগত অসুস্থ করে তুলছে বৃদ্ধ ও শিশুদের। এমনকি শ্রবণ শক্তি হারাতে বসেছে অনেক শিশু। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা তিন থেকে চারগুণেরও বেশি। উন্নত বিশ্বে যানবাহনের হর্ন বাজানো নিয়ে কড়াকড়ি আইন থাকলেও রাজধানীতে এর কোনো প্রয়োগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের সামনে দিয়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে গাড়ি চালিয়ে গেলেও তা দেখার কেউ নেই। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধি-বিধান থাকলেও সেগুলোর কোনো প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে শব্দ দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ভয়াবহভাবে বেড়েছে শব্দ দূষণ। শব্দ দূষণ রোধে সরকারের আইন রয়েছে। অথচ এর প্রতিকার না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষের শব্দ দূষণ সম্পর্কে ধারণা নেই। একইসঙ্গে সমাজে সচেতনতার বড়ই অভাব রয়েছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সচেতনতার অভাবই শব্দ দূষণ মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত শব্দ দূষণে বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অসুস্থ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০টি বড় বড় রোগের কারণ ১২ ধরনের পরিবেশ দূষণ। তার মধ্যে শব্দ দূষণ অন্যতম। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের শব্দ দূষণের মাত্রা ৬০ থেকে শুরু করে কোনো কোনো স্থানে ১২০ ডেসিবল পর্যন্ত রয়েছে। যা মানুষের শারীরিক-মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞ চিকিত্করা বলছেন, ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে কানের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ে তখন সে স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পায় না। আর লেখাপড়ায় অমনোযোগী ও বিকার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে। এছাড়া শব্দ দূষণের ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা ঘটতে পারে। শিশুদের মধ্যে মানসিক ভীতি দেখা দেয়। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষের করোনারি হার্ট ডিজিজ হতে পারে। তিনি বলেন, শব্দ দূষণ একটি নীরব ঘাতক। উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হূদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহে রক্তচাপ ও হূদকম্পন বাড়িয়ে দেয়, মাংসপেশি সংকোচন করে এবং পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়। এছাড়াও শ্রবণশক্তি কমে আসে, বধির হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, বিরক্তিবোধ, বদহজম, অনিদ্রাসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, হঠাত্ বিকট শব্দ যেমন যানবাহনের তীব্র হর্ন বা পটকা ফাটার আওয়াজ মানুষের শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়। এ ধরনের শব্দের প্রভাবে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়, রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন মোটরযানের চালককে বেপরোয়া ও দ্রুত গতিতে যান চালাতে উত্সাহিত করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। রাজধানীজুড়ে হর্ন বাজানো নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। আর এসব হর্নের মধ্যে বেশির ভাগ হাইড্রোলিক হর্ন। এসব হর্ন হাইওয়েতে ব্যবহারের কথা থাকলেও তা এখন ঢাকা সিটিতে ব্যবহূত হচ্ছে। তা দেখার যেন কেউ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসতি এলাকা দিনের বেলা ৫৫ ডিবি, রাতে ৪৫ ডিবি হওয়া উচিত। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডিবি, রাতে ৫৫ ডিবি, শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডিবি, রাতে ৬৫ ডিবির মধ্যে শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডিবি শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। অর্থাত্ এই মাত্রার মধ্যে থাকা আমাদের মধ্যে সহনীয়। এর বেশি হলেই দূষণ হিসেবে তা চিহ্নিত হয়।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, নীরব এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা মানমাত্রার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ, আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা দেড় গুণ ও রাতে শব্দের মাত্রা দেড় থেকে প্রায় দুই গুণ, মিশ্র এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা দেড় গুণ ও রাতে শব্দের মাত্রা দেড় থেকে দুই গুণেরও বেশি। এছাড়া বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা মানমাত্রার চেয়ে দেড় গুণ বেশি। নীরব এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ইডেন মহিলা কলেজের সামনে, ১০৪.৪ ডেসিবল। মিশ্র এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পল্টনে ১০৫.৫ ডেসিবল। আর রাতে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি কলাবাগানে ১০৬.৪ ডেসিবল। অন্যদিকে বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে, ১০৮.৯ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে জানা যায়, ঢাকায় যানবাহনের শব্দের পরিমাণ ৯৫ ডেসিবল, কল-কারখানায় ৮০-৯০ ডেসিবল, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁতে ৭৫-৯০ ডেসিবল, যে কোনো অনুষ্ঠানে ৮৫-৯০ ডেসিবল, মোটরবাইকে ৮৭-৯২ ডেসিবল, বাস এবং ট্রাকে ৯২-৯৪ ডেসিবল। নামমাত্র জরিমানার বিধান থাকলেও তা প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে।
আকস্মিক হর্নের শব্দে একজন মানুষ বধির কিংবা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। অথচ এই অপরাধের জরিমানা মাত্র একশ’ টাকা। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের কাছে শব্দ পরিমাপের কোনো যন্ত্র না থাকায় তারাও বুঝতে পারে না কোন গাড়ি অতিরিক্ত মাত্রার হর্ন বাজিয়ে শব্দ দূষণ করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ দূষণ যে কোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশু ও নারী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, রিকশা বা গাড়িচালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: এ. কে. এম জায়েদ হোসেন খান, নির্বাহী সম্পাদক: নাজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Developed & Maintainance by i2soft